ঢাকা    সোমবার, ২৬ অক্টোবর ২০২৬, ১১ কার্তিক ১৪৩৩
নেত্র দেশ ২৪

মাজেদুল হক: সৃজনশীল সাহিত্যের পাঠকনন্দিত বিরহী কবি

বিরহী কবি মাজেদুল হক: ছন্দ, সৃজনশীলতা ও জীবনবোধের অনন্য কাব্যভুবন



বিরহী কবি মাজেদুল হক: ছন্দ, সৃজনশীলতা ও জীবনবোধের অনন্য কাব্যভুবন
কবি মাজেদুল হক—‘বিরহী কবি’ উপাধিতে পরিচিত একজন সৃজনশীল সাহিত্যিক।
বিরহী কবি মাজেদুল হকের জীবন, সাহিত্যচর্চা, পুরস্কার ও ‘ছন্দরীতি’, ‘ছড়া’, ‘পড়তে হবে’, ‘মায়ের আদালত’, ‘ভূতের বাড়ি’, ‘মালিকানা’ এবং ‘বর্গাচাষী’ কবিতা ও ছড়ার বিষয়বস্তু নিয়ে বিস্তারিত ফিচার।

বিরহী কবি’ উপাধিতে ভূষিত, ছান্দসিক রীতির সুপরিচিত ও জনপ্রিয় কবি মাজেদুল হক সৃজনশীল সাহিত্যের একজন ধ্রুপদি স্বপ্নদ্রষ্টা। প্রথাগত ছন্দের পাশাপাশি আধুনিক গদ্যছন্দেও তিনি দেখিয়েছেন মুন্সিয়ানা। কবিতায় ছন্দের ব্যবহার, নতুন ছন্দরীতি ও ছন্দকাঠামো নির্মাণ এবং স্বতন্ত্র ছন্দরীতিতে নান্দনিক কবিতা রচনার মাধ্যমে তিনি নিজের সাহিত্যিক বৈশিষ্ট্য তুলে ধরেছেন।

ছন্দের নিয়ম, মাত্রার হিসাব এবং কবিতার শিল্পগুণ সম্পর্কে কবির নিজস্ব ভাবনা ফুটে উঠেছে তাঁর ‘ছন্দরীতি’ শিরোনামের কবিতায়।

ছন্দরীতি

আগে তুমি শিখে লও প্রথাগত নীতি,

পরে কবি সৃষ্টি করো নব ছন্দরীতি।

স্বরবৃত্ত মাত্রাবৃত্ত অক্ষরবৃত্তটি,

লিখিবে শুদ্ধ কবিতা না করিবে ত্রুটি।

মুক্তক অতি মুক্তক অমিত্রাক্ষর কি?

গৈরিশ ও গদ্যছন্দ মাত্রা বুঝে লিখি।

অমিল সমিল সবি অন্ত্যমিলে খুঁজে,

মাত্রা হিসেব করিয়া নিতে হবে বুঝে।

ছন্দের নিয়মে আছে খুঁটিনাটি যত,

ব্যাকরণ জেনে বুঝে করিবে আয়ত্ত।

না বুঝে করিলে কিছু ফলাফল মন্দ,

কবিতায় প্রয়োজন শিল্পগুণে ছন্দ।

ছন্দরীতি কবিগণ করে যত সৃষ্টি,

প্রতিভায় যোগ হবে প্রসন্ন সুদৃষ্টি।

‘বিরহী কবি’ উপাধি লাভ

বিরহী কবি উপাধিতে ভূষিত সনদ(২০২২ খ্রীস্টাব্দ)

কলম একাডেমি লন্ডন ও কলম টিভির প্রতিষ্ঠাতা অধ্যাপক নজরুল ইসলাম হাবিবী ২০২২ খ্রিষ্টাব্দে একাডেমির পক্ষ থেকে কবি মাজেদুল হককে বাংলা সাহিত্যে বিশেষ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ‘বিরহী কবি’ উপাধিতে ভূষিত করেন। কবির সাহিত্যচিন্তা ও সৃজনশীল কাজের আলোকে তাঁকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে এ উপাধি দেওয়া হয় বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এ উপলক্ষে কবিকে ‘বিরহী কবি’ উপাধিতে ভূষিত করার সনদও প্রদান করা হয়।

প্রকৃতপক্ষে, কবি মাজেদুল হক সৃজনশীল সাহিত্যের একজন নিবেদিতপ্রাণ কবি। তাঁর কাব্যিক শৈলী, ছন্দের ব্যবহার এবং জীবনঘনিষ্ঠ বিষয়বস্তুর উপস্থাপন তাঁকে পাঠকের কাছে স্বতন্ত্র পরিচিতি দিয়েছে।

জন্ম ও সাহিত্যচর্চার সূচনা

কবি মাজেদুল হক ১৯৭৭ খ্রিষ্টাব্দের ৩ জুলাই, ১৯ আষাঢ়, বাংলাদেশের নেত্রকোনা জেলার সদর উপজেলার পাটলী গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম এস এম কিতাব আলী এবং মাতার নাম বেগম আয়েশা খাতুন।

কিশোর বয়স থেকেই লেখালেখির প্রতি তাঁর আগ্রহ তৈরি হয়। স্নাতক (বিএ) পর্যায়ে অধ্যয়নরত অবস্থায় তাঁর লেখা প্রথম পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। এরপর থেকে স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ের বিভিন্ন পত্রিকায় নিয়মিত প্রকাশিত হচ্ছে তাঁর লেখা।

প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরে কর্মরত থাকার পাশাপাশি সময় ও সুযোগ পেলেই তিনি চালিয়ে যাচ্ছেন সৃজনশীল সাহিত্যচর্চা। কর্মব্যস্ত জীবনের মধ্যেও লেখালেখির প্রতি তাঁর অনুরাগ অব্যাহত রয়েছে।

সেরা ছড়াকার সম্মাননা

২০১৭ খ্রিষ্টাব্দে ‘মুক্তির আশা’ ও ‘নেত্রের আশা’ পত্রিকার যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত ছড়া প্রতিযোগিতায় সেরা ছড়াকার নির্বাচিত হন কবি মাজেদুল হক।

সেরা ছড়াকার সম্মাননা" গ্রহণ সময়ের ছবি(২০১৭ খ্রীস্টাব্দ)

এ উপলক্ষে নেত্রকোনা জেলা প্রেসক্লাবে আয়োজিত এক জনসমাবেশে তৎকালীন দায়িত্বপ্রাপ্ত জেলা প্রশাসক ড. মুশফিকুর রহমান কবির হাতে ‘সেরা ছড়াকার সম্মাননা’ স্মারক তুলে দেন। একই অনুষ্ঠানে দেশবরেণ্য শিক্ষাবিদ ও প্রাবন্ধিক অধ্যাপক যতীন সরকার কবিকে উত্তরীয় পরিয়ে সম্মানিত করেন।

শিশুতোষ ছড়ায় শিক্ষা ও নৈতিকতার বার্তা

কবি মাজেদুল হক শিশুদের জন্য লিখেছেন বিভিন্ন শিক্ষামূলক ছড়া। তাঁর এসব ছড়ায় শিশুদের শিক্ষার প্রতি আগ্রহী করে তোলা, নৈতিকতা শেখানো এবং আদর্শ চরিত্র গঠনে উৎসাহিত করার বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে।

ছড়ার অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছন্দ ও তাল। একটি ভালো ছড়া পাঠকের মনে আনন্দ জাগায় এবং সহজে মনে রাখার মতো হয়ে ওঠে। ছড়ার গঠন ও ছন্দের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে কবি তাঁর ‘ছড়া’ শিরোনামের ছড়ায় লিখেছেন—

ছড়া

ছড়ায় যদি ছন্দ থাকে

পড়তে লাগে ভালো-ও,

ছন্দ ছাড়া অনেক ছড়া

পায় না খুঁজে তাল-ও।

ছন্দ ছাড়া লিখেন ছড়া

দোষ রয়ে যায় দুটি,

মাত্রা হিসেব ঠিক থাকে না

তাল লয়ে হয় ত্রুটি।

অন্ত্যমিলে লিখেন ছড়া

ঠিক না রেখে ছন্দ,

এমন ছড়া নিয়ে আছে

ছান্দসিকের দ্বন্দ্ব।

পাঠক পড়ে তৃপ্তি পেলে

সেই ছড়াটি বেশ,

ভালো ছড়ায় আলো ছড়ায়

মজার নেই তো শেষ।

কবিতাটিতে ছড়ার ছন্দ, মাত্রা, তাল ও অন্ত্যমিলের গুরুত্ব তুলে ধরা হয়েছে। কবির দৃষ্টিতে, একটি ছড়ার পাঠযোগ্যতা ও নান্দনিকতা বাড়াতে ছন্দের সঠিক প্রয়োগ গুরুত্বপূর্ণ।

‘পড়তে হবে’ ছড়ায় শিক্ষার গুরুত্ব

প্রতিটি শিশুর জীবনে শিক্ষার গুরুত্ব অপরিসীম। শিক্ষা মানুষকে জ্ঞানী করে, ভালো-মন্দের পার্থক্য বুঝতে শেখায় এবং জীবনের নানা পরিস্থিতিতে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে সহায়তা করে। সন্তানের প্রতি বাবার উপদেশ এবং শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা কবি মাজেদুল হক তাঁর ‘পড়তে হবে’ শিরোনামের ছড়ায় তুলে ধরেছেন।

পড়তে হবে

ছুটির দিনে মনের সুখে

চলছে খোকা মাঠে,

বাবার সাথে দিন-দুপুরে

ইচ্ছে মতো খাটে।

মাঠের ধূলি খোকার গায়ে

সবই গেল মেখে,

এখন খোকা কাজের ছেলে

হাসছে বাবা দেখে।

রোদের তাপে ঘামছে খোকা

বাবায় বলে, রাখো,

গাছের ছায়া জুড়ায় দেহ

একটু বসে থাকো।

বুঝায় বাবা পড়তে হবে

রাখিস মনে খোকা,

মূর্খ হলে সুযোগ বুঝে

দেয় মানুষে ধোঁকা।

ছড়াটিতে শিশুর প্রতি বাবার স্নেহ, উপদেশ এবং শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা সহজ ভাষায় তুলে ধরা হয়েছে। এর মাধ্যমে শিশুদের পড়াশোনার প্রতি মনোযোগী হওয়ার পাশাপাশি জ্ঞান অর্জনের গুরুত্ব বোঝানোর চেষ্টা করেছেন কবি।

‘মায়ের আদালত’ ছড়ায় পারিবারিক শিক্ষা

প্রতিটি সন্তানের প্রথম শিক্ষক তার মা। মায়ের হাত ধরেই শিশুর প্রাথমিক শিক্ষার সূচনা হয়। সন্তানের ভালো-মন্দের বিচার, ভুল সংশোধন এবং নৈতিক মূল্যবোধ গড়ে তোলার ক্ষেত্রে মায়ের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।

সন্তানের প্রতি মায়ের স্নেহ, আদরসুলভ শাসন ও ন্যায়বিচারের বিষয়টি কবি মাজেদুল হক তাঁর ‘মায়ের আদালত’ শিরোনামের ছড়ায় তুলে ধরেছেন।

মায়ের আদালত

খেলার শেষে ক্লান্ত হয়ে

ঢুকছে খোকা ঘরে,

বলছে মায়ে দাঁড়াও খোকা

চলবে হিসেব করে।

খেলতে গিয়ে ঝগড়া করো

রোজই আসে নালিশ,

তোমার স্বভাব এমন কেন

করব কত সালিশ?

ঝগড়া আমি করব না মা

মাফ করে দাও আজি,

ভুল হয়েছে কান ধরেছি

আদেশ মানতে রাজি।

খোকার চোখে অশ্রু দেখে

নিলেন টেনে বুকে,

আঁচল দিয়া চোখ মুছিয়া

চুমু দিলেন মুখে।

শিশুর যত বিচার আসে

খেলার উঠোন হতে,

এসব কিছু ফয়সালা হয়

মায়ের আদালতে।

ছড়াটিতে মা ও সন্তানের স্নেহময় সম্পর্কের পাশাপাশি শিশুর ভুল সংশোধন এবং ক্ষমা করার সুন্দর দিকটি ফুটে উঠেছে। শাসনের মধ্যেও যে ভালোবাসা ও মমতা থাকে, কবি তা সহজ ও সাবলীল ভাষায় প্রকাশ করেছেন।

‘ভূতের বাড়ি’ ছড়ায় কুসংস্কারবিরোধী বার্তা

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির উন্নতির এই যুগেও সমাজের কিছু মানুষের মধ্যে কুসংস্কার ও অন্ধবিশ্বাসের প্রবণতা দেখা যায়। অনেক সময় অজানা ভয় কিংবা অসুস্থতাকে অতিপ্রাকৃত ঘটনার সঙ্গে যুক্ত করা হয়। এ ধরনের অন্ধবিশ্বাসের পরিবর্তে যুক্তিবোধ ও সচেতনতার গুরুত্ব তুলে ধরেছেন কবি মাজেদুল হক তাঁর ‘ভূতের বাড়ি’ শিরোনামের ছড়ায়।

ভূতের বাড়ি

পুকুর পাড়ে ঝোপের ধারে

ঐ যে তেঁতুল গাছে,

রাত নিশিতে পায় দেখিতে

ভূত-পেতনি নাচে।

মনের ভয়ে বউ-ঝি লয়ে

দেয় না এ পথ পাড়ি,

বলছে সবে এটাই তবে

হয়তো ভূতের বাড়ি।

জোয়ান নারী রঙিন শাড়ি

সেদিন গেল পরে,

ভূতের নজর করছে আছর

রয় না এখন ঘরে।

ওঝায় গিয়ে ঝাড়ফুঁক দিয়ে

বলছে এটা দৃষ্টি,

ডাক্তার বলে টেনশন হলে

হয় মনোরোগ সৃষ্টি।

ঔষধ খেয়ে সুস্থ মেয়ে

নেই তো কোনো রোগ,

ভূতের গল্প গুজব অল্প

মিথ্যে অভিযোগ।

ছড়াটিতে ভূত-পেতনি ও ঝাড়ফুঁককেন্দ্রিক বিশ্বাসের বিপরীতে চিকিৎসা ও যুক্তিবোধের গুরুত্ব তুলে ধরা হয়েছে। মানুষের অমূলক ভয় দূর করা এবং অসুস্থতার ক্ষেত্রে যথাযথ চিকিৎসার প্রতি গুরুত্ব দেওয়ার বার্তা এতে পাওয়া যায়।

‘জহিরুল সাহিত্য পুরস্কার’ লাভ

জহিরুল সাহিত্য পুরষ্কার (২০২৪ খ্রীস্টাব্দ)

২০২৪ খ্রিষ্টাব্দে সাহিত্যে বিশেষ অবদানের জন্য ‘হাজার কবির কবিতা সাহিত্য পরিষদ’-এর পক্ষ থেকে কবি মাজেদুল হককে ‘জহিরুল সাহিত্য পুরস্কার’ প্রদান করা হয় বলে উল্লেখ করা হয়েছে। সাহিত্যচর্চায় তাঁর অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে এ পুরস্কারের কথা তুলে ধরা হয়েছে।

‘মালিকানা’ কবিতায় সম্পদের মোহ ও নৈতিকতার শিক্ষা

মানুষ সংসারজীবনের মায়া, অর্থ-সম্পদ ও ব্যক্তিস্বার্থের টানে অনেক সময় পরকালের চিন্তা ভুলে যায়। পার্থিব সম্পদ একসময় অন্যের মালিকানায় চলে যাবে—এই বাস্তবতা স্মরণ করিয়ে দিয়ে কবি মাজেদুল হক তাঁর ‘মালিকানা’ কবিতায় সততা, সংযম ও সৎপথে উপার্জনের গুরুত্ব তুলে ধরেছেন।

কবিতায় তিনি লিখেছেন—

মালিকানা

অর্থ বিত্ত রত্ন সবি কষ্টের ফসল,

জীবন চলার পথে একান্ত সম্বল।

মৃত্যুর পরে সম্পদ অন্যজনে পাবে,

এমন ভাবনা কভু মানুষ কি ভাবে?

উত্তরাধিকারী সূত্রে হবে ভাগাভাগি,

পরিশ্রম করি তবু সম্পদের লাগি।

অর্থের লোভে জগতে এত যে বাহানা,

মরণোত্তর সন্তান পাবে মালিকানা।

যতটুকু ভাগ্যে আছে না হলে সবুর,

পূরণ হবে না আশা গেলে বহুদূর।

ক্ষণিকের খেলাঘরে অতিথি সবাই,

অধিকার নিয়ে কেন এতটা বড়াই?

অন্যের ভান্ডার যদি করো আহরণ,

হিসেব দিতেই হবে রাখিও স্মরণ।

সততাই মূলধন মনে রেখো সবে,

সুপথে রোজগার তোমার উন্নয়ন হবে।

অনন্ত বছর তুমি যেখানে রহিবে,

কামাই করেছ কিছু পরপারে নিবে?

কবিতাটিতে মানুষের পার্থিব সম্পদের প্রতি মোহ, উত্তরাধিকার, অন্যের সম্পদ আত্মসাৎ করার পরিণতি এবং পরকালের জবাবদিহির বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে। কবির বক্তব্যে সততাকে জীবনের অন্যতম মূলধন হিসেবে দেখানো হয়েছে। তাঁর এই কাব্যিক ভাবনা মানুষকে নৈতিক জীবনযাপন ও সৎপথে উপার্জনের প্রতি উৎসাহিত করে।

‘বর্গাচাষী’ কবিতায় দরিদ্র কৃষকের জীবনচিত্র

কৃষিপ্রধান বাংলাদেশে বহু মানুষ কৃষির ওপর নির্ভরশীল। তবে ভূমিহীন ও দরিদ্র কৃষকদের জীবন নানা অভাব-অনটন, ঋণ এবং অনিশ্চয়তায় জর্জরিত। অন্যের জমিতে চাষাবাদ করে উৎপাদিত ফসলের ভাগ পেয়েও অনেক সময় তাঁদের সারা বছরের খাদ্যের সংস্থান হয় না।

এমনই এক দরিদ্র বর্গাচাষীর জীবনসংগ্রাম, পারিবারিক অভাব এবং ঋণের বোঝার চিত্র কবি মাজেদুল হক তাঁর ‘বর্গাচাষী’ কবিতায় তুলে ধরেছেন।

বর্গাচাষী

বসতভিটায় আছে ভূমি অল্পখান,

তাহার কাছে এটাই অতি মূল্যবান।

পৈত্রিক সূত্রে পেয়েছে এতটুকু বাড়ি,

অভাব ও অভিযোগে চলেছে সংসারী।

চাষের জমি নিজের না থাকায় মাঠে,

পরের জমিতে চাষি বর্গাভাগে খাটে।

খড়ের ছাউনি চালে পাটখড়িতে বেড়া,

বর্ষাকালে বৃষ্টি পড়ে ঘর ভিজে নেড়া।

ক্ষেতের ফসল বর্গায় চলে না খোরাকি,

অর্ধেক খোরাক চলে অর্ধ রয় বাকি।

কয়েক মাসের খাদ্য চলে বর্গাচাষে,

বাকি খোরাক তাহার কর্জ করে আসে।

কার্তিক চৈত্রে উপোষ জোটে না খাবার,

বাজার হতে কিনিয়া আনিছে আহার।

শ্রমের টাকায় চলে সংসার অভাবে,

রোজগার না হলে সুদের টাকায় চালাবে।

মহাজনের সুদের টাকা দিতে গিয়ে,

ঘরে ফিরে চাষি চোখে অশ্রুঝর্ণা নিয়ে।

অর্থের অভাবে চাষি পরিশ্রম করে,

পরের বাড়িতে খাটে সে পরের ঘরে।

অভাব অভিযোগে সে মুখে লয়ে হাসি,

সংসার চালায় তবু সুখে বারোমাসি।

‘বর্গাচাষী’ কবিতায় দরিদ্র কৃষকের অর্থনৈতিক দুরবস্থা, খাদ্যসংকট, ঋণের চাপ এবং পরিবারের ভরণপোষণের সংগ্রাম ফুটে উঠেছে। উৎপাদনের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত থেকেও একজন কৃষক কীভাবে অভাবের মধ্যে জীবন কাটান, তা কবি তাঁর কাব্যিক বর্ণনায় তুলে ধরেছেন। একই সঙ্গে প্রতিকূলতার মধ্যেও সংসার চালিয়ে যাওয়ার যে জীবনসংগ্রাম, সেটিও কবিতাটির গুরুত্বপূর্ণ দিক।

সাহিত্যের বিভিন্ন শাখায় বিরহী কবির বিচরণ

কবি মাজেদুল হক শুধু কবিতাই লেখেন না; গান, ছড়া, গল্প, প্রবন্ধ ও উপন্যাস রচনাতেও তাঁর সম্পৃক্ততা রয়েছে। সাহিত্যের বিভিন্ন শাখায় তাঁর সৃজনশীল লেখালেখির পরিচয় পাওয়া যায়। নিজের প্রকাশিত একক কাব্যগ্রন্থের পাশাপাশি শতাধিক সংকলনে তাঁর কবিতা প্রকাশিত হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

তাঁর কবিতায় বিরহের অনুভূতি, জীবনবোধ, নৈতিক শিক্ষা ও সাধারণ মানুষের জীবনসংগ্রাম নানা আঙ্গিকে প্রকাশ পেয়েছে। বিশেষ করে বিরহের অনুভূতিকে কাব্যিক ভাষায় প্রকাশ করার দক্ষতার কারণে তিনি ‘বিরহী কবি’ হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছেন।

প্রথাগত ছন্দ ও আধুনিক গদ্যছন্দে লেখালেখি, শিশুতোষ ছড়ায় শিক্ষামূলক বার্তা, কুসংস্কারবিরোধী ভাবনা এবং সমাজের সাধারণ মানুষের দুঃখ-কষ্ট তুলে ধরার মধ্য দিয়ে কবি মাজেদুল হকের সাহিত্যচর্চার বহুমাত্রিকতা প্রতিফলিত হয়েছে।

বাংলা সাহিত্যে তাঁর অবদান ও কাব্যিক বৈশিষ্ট্য নিয়ে পাঠক, সাহিত্যিক ও সমালোচকদের মূল্যায়ন আরও বিস্তৃত আলোচনার দাবি রাখে। বিরহের অনুভূতি, ছন্দের কারুকার্য এবং জীবনঘনিষ্ঠ বিষয়বস্তুর সমন্বয়ে কবি মাজেদুল হক নিজের সাহিত্যিক পরিচয় নির্মাণ করে চলেছেন।

বিষয় : বিরহী কবি মাজেদুল হকের কবিতা ছন্দরীতি বাংলা ছড়া মালিকানা কবিতা বর্গাচাষী কবিতা জহিরুল সাহিত্য পুরস্কার

0.0%
0.0%
0.0%
0.0%

মতামত

নেত্র দেশ ২৪

সোমবার, ২৬ অক্টোবর ২০২৬


বিরহী কবি মাজেদুল হক: ছন্দ, সৃজনশীলতা ও জীবনবোধের অনন্য কাব্যভুবন

প্রকাশের তারিখ : ২৬ অক্টোবর ২০২৬

featured Image
বিরহী কবি মাজেদুল হকের জীবন, সাহিত্যচর্চা, পুরস্কার ও ‘ছন্দরীতি’, ‘ছড়া’, ‘পড়তে হবে’, ‘মায়ের আদালত’, ‘ভূতের বাড়ি’, ‘মালিকানা’ এবং ‘বর্গাচাষী’ কবিতা ও ছড়ার বিষয়বস্তু নিয়ে বিস্তারিত ফিচার।

বিরহী কবি’ উপাধিতে ভূষিত, ছান্দসিক রীতির সুপরিচিত ও জনপ্রিয় কবি মাজেদুল হক সৃজনশীল সাহিত্যের একজন ধ্রুপদি স্বপ্নদ্রষ্টা। প্রথাগত ছন্দের পাশাপাশি আধুনিক গদ্যছন্দেও তিনি দেখিয়েছেন মুন্সিয়ানা। কবিতায় ছন্দের ব্যবহার, নতুন ছন্দরীতি ও ছন্দকাঠামো নির্মাণ এবং স্বতন্ত্র ছন্দরীতিতে নান্দনিক কবিতা রচনার মাধ্যমে তিনি নিজের সাহিত্যিক বৈশিষ্ট্য তুলে ধরেছেন।

ছন্দের নিয়ম, মাত্রার হিসাব এবং কবিতার শিল্পগুণ সম্পর্কে কবির নিজস্ব ভাবনা ফুটে উঠেছে তাঁর ‘ছন্দরীতি’ শিরোনামের কবিতায়।

ছন্দরীতি

আগে তুমি শিখে লও প্রথাগত নীতি,

পরে কবি সৃষ্টি করো নব ছন্দরীতি।

স্বরবৃত্ত মাত্রাবৃত্ত অক্ষরবৃত্তটি,

লিখিবে শুদ্ধ কবিতা না করিবে ত্রুটি।

মুক্তক অতি মুক্তক অমিত্রাক্ষর কি?

গৈরিশ ও গদ্যছন্দ মাত্রা বুঝে লিখি।

অমিল সমিল সবি অন্ত্যমিলে খুঁজে,

মাত্রা হিসেব করিয়া নিতে হবে বুঝে।

ছন্দের নিয়মে আছে খুঁটিনাটি যত,

ব্যাকরণ জেনে বুঝে করিবে আয়ত্ত।

না বুঝে করিলে কিছু ফলাফল মন্দ,

কবিতায় প্রয়োজন শিল্পগুণে ছন্দ।

ছন্দরীতি কবিগণ করে যত সৃষ্টি,

প্রতিভায় যোগ হবে প্রসন্ন সুদৃষ্টি।

‘বিরহী কবি’ উপাধি লাভ

বিরহী কবি উপাধিতে ভূষিত সনদ(২০২২ খ্রীস্টাব্দ)

কলম একাডেমি লন্ডন ও কলম টিভির প্রতিষ্ঠাতা অধ্যাপক নজরুল ইসলাম হাবিবী ২০২২ খ্রিষ্টাব্দে একাডেমির পক্ষ থেকে কবি মাজেদুল হককে বাংলা সাহিত্যে বিশেষ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ‘বিরহী কবি’ উপাধিতে ভূষিত করেন। কবির সাহিত্যচিন্তা ও সৃজনশীল কাজের আলোকে তাঁকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে এ উপাধি দেওয়া হয় বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এ উপলক্ষে কবিকে ‘বিরহী কবি’ উপাধিতে ভূষিত করার সনদও প্রদান করা হয়।

প্রকৃতপক্ষে, কবি মাজেদুল হক সৃজনশীল সাহিত্যের একজন নিবেদিতপ্রাণ কবি। তাঁর কাব্যিক শৈলী, ছন্দের ব্যবহার এবং জীবনঘনিষ্ঠ বিষয়বস্তুর উপস্থাপন তাঁকে পাঠকের কাছে স্বতন্ত্র পরিচিতি দিয়েছে।

জন্ম ও সাহিত্যচর্চার সূচনা

কবি মাজেদুল হক ১৯৭৭ খ্রিষ্টাব্দের ৩ জুলাই, ১৯ আষাঢ়, বাংলাদেশের নেত্রকোনা জেলার সদর উপজেলার পাটলী গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম এস এম কিতাব আলী এবং মাতার নাম বেগম আয়েশা খাতুন।

কিশোর বয়স থেকেই লেখালেখির প্রতি তাঁর আগ্রহ তৈরি হয়। স্নাতক (বিএ) পর্যায়ে অধ্যয়নরত অবস্থায় তাঁর লেখা প্রথম পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। এরপর থেকে স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ের বিভিন্ন পত্রিকায় নিয়মিত প্রকাশিত হচ্ছে তাঁর লেখা।

প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরে কর্মরত থাকার পাশাপাশি সময় ও সুযোগ পেলেই তিনি চালিয়ে যাচ্ছেন সৃজনশীল সাহিত্যচর্চা। কর্মব্যস্ত জীবনের মধ্যেও লেখালেখির প্রতি তাঁর অনুরাগ অব্যাহত রয়েছে।

সেরা ছড়াকার সম্মাননা

২০১৭ খ্রিষ্টাব্দে ‘মুক্তির আশা’ ও ‘নেত্রের আশা’ পত্রিকার যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত ছড়া প্রতিযোগিতায় সেরা ছড়াকার নির্বাচিত হন কবি মাজেদুল হক।

সেরা ছড়াকার সম্মাননা" গ্রহণ সময়ের ছবি(২০১৭ খ্রীস্টাব্দ)

এ উপলক্ষে নেত্রকোনা জেলা প্রেসক্লাবে আয়োজিত এক জনসমাবেশে তৎকালীন দায়িত্বপ্রাপ্ত জেলা প্রশাসক ড. মুশফিকুর রহমান কবির হাতে ‘সেরা ছড়াকার সম্মাননা’ স্মারক তুলে দেন। একই অনুষ্ঠানে দেশবরেণ্য শিক্ষাবিদ ও প্রাবন্ধিক অধ্যাপক যতীন সরকার কবিকে উত্তরীয় পরিয়ে সম্মানিত করেন।

শিশুতোষ ছড়ায় শিক্ষা ও নৈতিকতার বার্তা

কবি মাজেদুল হক শিশুদের জন্য লিখেছেন বিভিন্ন শিক্ষামূলক ছড়া। তাঁর এসব ছড়ায় শিশুদের শিক্ষার প্রতি আগ্রহী করে তোলা, নৈতিকতা শেখানো এবং আদর্শ চরিত্র গঠনে উৎসাহিত করার বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে।

ছড়ার অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছন্দ ও তাল। একটি ভালো ছড়া পাঠকের মনে আনন্দ জাগায় এবং সহজে মনে রাখার মতো হয়ে ওঠে। ছড়ার গঠন ও ছন্দের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে কবি তাঁর ‘ছড়া’ শিরোনামের ছড়ায় লিখেছেন—

ছড়া

ছড়ায় যদি ছন্দ থাকে

পড়তে লাগে ভালো-ও,

ছন্দ ছাড়া অনেক ছড়া

পায় না খুঁজে তাল-ও।

ছন্দ ছাড়া লিখেন ছড়া

দোষ রয়ে যায় দুটি,

মাত্রা হিসেব ঠিক থাকে না

তাল লয়ে হয় ত্রুটি।

অন্ত্যমিলে লিখেন ছড়া

ঠিক না রেখে ছন্দ,

এমন ছড়া নিয়ে আছে

ছান্দসিকের দ্বন্দ্ব।

পাঠক পড়ে তৃপ্তি পেলে

সেই ছড়াটি বেশ,

ভালো ছড়ায় আলো ছড়ায়

মজার নেই তো শেষ।

কবিতাটিতে ছড়ার ছন্দ, মাত্রা, তাল ও অন্ত্যমিলের গুরুত্ব তুলে ধরা হয়েছে। কবির দৃষ্টিতে, একটি ছড়ার পাঠযোগ্যতা ও নান্দনিকতা বাড়াতে ছন্দের সঠিক প্রয়োগ গুরুত্বপূর্ণ।

‘পড়তে হবে’ ছড়ায় শিক্ষার গুরুত্ব

প্রতিটি শিশুর জীবনে শিক্ষার গুরুত্ব অপরিসীম। শিক্ষা মানুষকে জ্ঞানী করে, ভালো-মন্দের পার্থক্য বুঝতে শেখায় এবং জীবনের নানা পরিস্থিতিতে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে সহায়তা করে। সন্তানের প্রতি বাবার উপদেশ এবং শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা কবি মাজেদুল হক তাঁর ‘পড়তে হবে’ শিরোনামের ছড়ায় তুলে ধরেছেন।

পড়তে হবে

ছুটির দিনে মনের সুখে

চলছে খোকা মাঠে,

বাবার সাথে দিন-দুপুরে

ইচ্ছে মতো খাটে।

মাঠের ধূলি খোকার গায়ে

সবই গেল মেখে,

এখন খোকা কাজের ছেলে

হাসছে বাবা দেখে।

রোদের তাপে ঘামছে খোকা

বাবায় বলে, রাখো,

গাছের ছায়া জুড়ায় দেহ

একটু বসে থাকো।

বুঝায় বাবা পড়তে হবে

রাখিস মনে খোকা,

মূর্খ হলে সুযোগ বুঝে

দেয় মানুষে ধোঁকা।

ছড়াটিতে শিশুর প্রতি বাবার স্নেহ, উপদেশ এবং শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা সহজ ভাষায় তুলে ধরা হয়েছে। এর মাধ্যমে শিশুদের পড়াশোনার প্রতি মনোযোগী হওয়ার পাশাপাশি জ্ঞান অর্জনের গুরুত্ব বোঝানোর চেষ্টা করেছেন কবি।

‘মায়ের আদালত’ ছড়ায় পারিবারিক শিক্ষা

প্রতিটি সন্তানের প্রথম শিক্ষক তার মা। মায়ের হাত ধরেই শিশুর প্রাথমিক শিক্ষার সূচনা হয়। সন্তানের ভালো-মন্দের বিচার, ভুল সংশোধন এবং নৈতিক মূল্যবোধ গড়ে তোলার ক্ষেত্রে মায়ের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।

সন্তানের প্রতি মায়ের স্নেহ, আদরসুলভ শাসন ও ন্যায়বিচারের বিষয়টি কবি মাজেদুল হক তাঁর ‘মায়ের আদালত’ শিরোনামের ছড়ায় তুলে ধরেছেন।

মায়ের আদালত

খেলার শেষে ক্লান্ত হয়ে

ঢুকছে খোকা ঘরে,

বলছে মায়ে দাঁড়াও খোকা

চলবে হিসেব করে।

খেলতে গিয়ে ঝগড়া করো

রোজই আসে নালিশ,

তোমার স্বভাব এমন কেন

করব কত সালিশ?

ঝগড়া আমি করব না মা

মাফ করে দাও আজি,

ভুল হয়েছে কান ধরেছি

আদেশ মানতে রাজি।

খোকার চোখে অশ্রু দেখে

নিলেন টেনে বুকে,

আঁচল দিয়া চোখ মুছিয়া

চুমু দিলেন মুখে।

শিশুর যত বিচার আসে

খেলার উঠোন হতে,

এসব কিছু ফয়সালা হয়

মায়ের আদালতে।

ছড়াটিতে মা ও সন্তানের স্নেহময় সম্পর্কের পাশাপাশি শিশুর ভুল সংশোধন এবং ক্ষমা করার সুন্দর দিকটি ফুটে উঠেছে। শাসনের মধ্যেও যে ভালোবাসা ও মমতা থাকে, কবি তা সহজ ও সাবলীল ভাষায় প্রকাশ করেছেন।

‘ভূতের বাড়ি’ ছড়ায় কুসংস্কারবিরোধী বার্তা

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির উন্নতির এই যুগেও সমাজের কিছু মানুষের মধ্যে কুসংস্কার ও অন্ধবিশ্বাসের প্রবণতা দেখা যায়। অনেক সময় অজানা ভয় কিংবা অসুস্থতাকে অতিপ্রাকৃত ঘটনার সঙ্গে যুক্ত করা হয়। এ ধরনের অন্ধবিশ্বাসের পরিবর্তে যুক্তিবোধ ও সচেতনতার গুরুত্ব তুলে ধরেছেন কবি মাজেদুল হক তাঁর ‘ভূতের বাড়ি’ শিরোনামের ছড়ায়।

ভূতের বাড়ি

পুকুর পাড়ে ঝোপের ধারে

ঐ যে তেঁতুল গাছে,

রাত নিশিতে পায় দেখিতে

ভূত-পেতনি নাচে।

মনের ভয়ে বউ-ঝি লয়ে

দেয় না এ পথ পাড়ি,

বলছে সবে এটাই তবে

হয়তো ভূতের বাড়ি।

জোয়ান নারী রঙিন শাড়ি

সেদিন গেল পরে,

ভূতের নজর করছে আছর

রয় না এখন ঘরে।

ওঝায় গিয়ে ঝাড়ফুঁক দিয়ে

বলছে এটা দৃষ্টি,

ডাক্তার বলে টেনশন হলে

হয় মনোরোগ সৃষ্টি।

ঔষধ খেয়ে সুস্থ মেয়ে

নেই তো কোনো রোগ,

ভূতের গল্প গুজব অল্প

মিথ্যে অভিযোগ।

ছড়াটিতে ভূত-পেতনি ও ঝাড়ফুঁককেন্দ্রিক বিশ্বাসের বিপরীতে চিকিৎসা ও যুক্তিবোধের গুরুত্ব তুলে ধরা হয়েছে। মানুষের অমূলক ভয় দূর করা এবং অসুস্থতার ক্ষেত্রে যথাযথ চিকিৎসার প্রতি গুরুত্ব দেওয়ার বার্তা এতে পাওয়া যায়।

‘জহিরুল সাহিত্য পুরস্কার’ লাভ

জহিরুল সাহিত্য পুরষ্কার (২০২৪ খ্রীস্টাব্দ)

২০২৪ খ্রিষ্টাব্দে সাহিত্যে বিশেষ অবদানের জন্য ‘হাজার কবির কবিতা সাহিত্য পরিষদ’-এর পক্ষ থেকে কবি মাজেদুল হককে ‘জহিরুল সাহিত্য পুরস্কার’ প্রদান করা হয় বলে উল্লেখ করা হয়েছে। সাহিত্যচর্চায় তাঁর অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে এ পুরস্কারের কথা তুলে ধরা হয়েছে।

‘মালিকানা’ কবিতায় সম্পদের মোহ ও নৈতিকতার শিক্ষা

মানুষ সংসারজীবনের মায়া, অর্থ-সম্পদ ও ব্যক্তিস্বার্থের টানে অনেক সময় পরকালের চিন্তা ভুলে যায়। পার্থিব সম্পদ একসময় অন্যের মালিকানায় চলে যাবে—এই বাস্তবতা স্মরণ করিয়ে দিয়ে কবি মাজেদুল হক তাঁর ‘মালিকানা’ কবিতায় সততা, সংযম ও সৎপথে উপার্জনের গুরুত্ব তুলে ধরেছেন।

কবিতায় তিনি লিখেছেন—

মালিকানা

অর্থ বিত্ত রত্ন সবি কষ্টের ফসল,

জীবন চলার পথে একান্ত সম্বল।

মৃত্যুর পরে সম্পদ অন্যজনে পাবে,

এমন ভাবনা কভু মানুষ কি ভাবে?

উত্তরাধিকারী সূত্রে হবে ভাগাভাগি,

পরিশ্রম করি তবু সম্পদের লাগি।

অর্থের লোভে জগতে এত যে বাহানা,

মরণোত্তর সন্তান পাবে মালিকানা।

যতটুকু ভাগ্যে আছে না হলে সবুর,

পূরণ হবে না আশা গেলে বহুদূর।

ক্ষণিকের খেলাঘরে অতিথি সবাই,

অধিকার নিয়ে কেন এতটা বড়াই?

অন্যের ভান্ডার যদি করো আহরণ,

হিসেব দিতেই হবে রাখিও স্মরণ।

সততাই মূলধন মনে রেখো সবে,

সুপথে রোজগার তোমার উন্নয়ন হবে।

অনন্ত বছর তুমি যেখানে রহিবে,

কামাই করেছ কিছু পরপারে নিবে?

কবিতাটিতে মানুষের পার্থিব সম্পদের প্রতি মোহ, উত্তরাধিকার, অন্যের সম্পদ আত্মসাৎ করার পরিণতি এবং পরকালের জবাবদিহির বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে। কবির বক্তব্যে সততাকে জীবনের অন্যতম মূলধন হিসেবে দেখানো হয়েছে। তাঁর এই কাব্যিক ভাবনা মানুষকে নৈতিক জীবনযাপন ও সৎপথে উপার্জনের প্রতি উৎসাহিত করে।

‘বর্গাচাষী’ কবিতায় দরিদ্র কৃষকের জীবনচিত্র

কৃষিপ্রধান বাংলাদেশে বহু মানুষ কৃষির ওপর নির্ভরশীল। তবে ভূমিহীন ও দরিদ্র কৃষকদের জীবন নানা অভাব-অনটন, ঋণ এবং অনিশ্চয়তায় জর্জরিত। অন্যের জমিতে চাষাবাদ করে উৎপাদিত ফসলের ভাগ পেয়েও অনেক সময় তাঁদের সারা বছরের খাদ্যের সংস্থান হয় না।

এমনই এক দরিদ্র বর্গাচাষীর জীবনসংগ্রাম, পারিবারিক অভাব এবং ঋণের বোঝার চিত্র কবি মাজেদুল হক তাঁর ‘বর্গাচাষী’ কবিতায় তুলে ধরেছেন।

বর্গাচাষী

বসতভিটায় আছে ভূমি অল্পখান,

তাহার কাছে এটাই অতি মূল্যবান।

পৈত্রিক সূত্রে পেয়েছে এতটুকু বাড়ি,

অভাব ও অভিযোগে চলেছে সংসারী।

চাষের জমি নিজের না থাকায় মাঠে,

পরের জমিতে চাষি বর্গাভাগে খাটে।

খড়ের ছাউনি চালে পাটখড়িতে বেড়া,

বর্ষাকালে বৃষ্টি পড়ে ঘর ভিজে নেড়া।

ক্ষেতের ফসল বর্গায় চলে না খোরাকি,

অর্ধেক খোরাক চলে অর্ধ রয় বাকি।

কয়েক মাসের খাদ্য চলে বর্গাচাষে,

বাকি খোরাক তাহার কর্জ করে আসে।

কার্তিক চৈত্রে উপোষ জোটে না খাবার,

বাজার হতে কিনিয়া আনিছে আহার।

শ্রমের টাকায় চলে সংসার অভাবে,

রোজগার না হলে সুদের টাকায় চালাবে।

মহাজনের সুদের টাকা দিতে গিয়ে,

ঘরে ফিরে চাষি চোখে অশ্রুঝর্ণা নিয়ে।

অর্থের অভাবে চাষি পরিশ্রম করে,

পরের বাড়িতে খাটে সে পরের ঘরে।

অভাব অভিযোগে সে মুখে লয়ে হাসি,

সংসার চালায় তবু সুখে বারোমাসি।

‘বর্গাচাষী’ কবিতায় দরিদ্র কৃষকের অর্থনৈতিক দুরবস্থা, খাদ্যসংকট, ঋণের চাপ এবং পরিবারের ভরণপোষণের সংগ্রাম ফুটে উঠেছে। উৎপাদনের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত থেকেও একজন কৃষক কীভাবে অভাবের মধ্যে জীবন কাটান, তা কবি তাঁর কাব্যিক বর্ণনায় তুলে ধরেছেন। একই সঙ্গে প্রতিকূলতার মধ্যেও সংসার চালিয়ে যাওয়ার যে জীবনসংগ্রাম, সেটিও কবিতাটির গুরুত্বপূর্ণ দিক।

সাহিত্যের বিভিন্ন শাখায় বিরহী কবির বিচরণ

কবি মাজেদুল হক শুধু কবিতাই লেখেন না; গান, ছড়া, গল্প, প্রবন্ধ ও উপন্যাস রচনাতেও তাঁর সম্পৃক্ততা রয়েছে। সাহিত্যের বিভিন্ন শাখায় তাঁর সৃজনশীল লেখালেখির পরিচয় পাওয়া যায়। নিজের প্রকাশিত একক কাব্যগ্রন্থের পাশাপাশি শতাধিক সংকলনে তাঁর কবিতা প্রকাশিত হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

তাঁর কবিতায় বিরহের অনুভূতি, জীবনবোধ, নৈতিক শিক্ষা ও সাধারণ মানুষের জীবনসংগ্রাম নানা আঙ্গিকে প্রকাশ পেয়েছে। বিশেষ করে বিরহের অনুভূতিকে কাব্যিক ভাষায় প্রকাশ করার দক্ষতার কারণে তিনি ‘বিরহী কবি’ হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছেন।

প্রথাগত ছন্দ ও আধুনিক গদ্যছন্দে লেখালেখি, শিশুতোষ ছড়ায় শিক্ষামূলক বার্তা, কুসংস্কারবিরোধী ভাবনা এবং সমাজের সাধারণ মানুষের দুঃখ-কষ্ট তুলে ধরার মধ্য দিয়ে কবি মাজেদুল হকের সাহিত্যচর্চার বহুমাত্রিকতা প্রতিফলিত হয়েছে।

বাংলা সাহিত্যে তাঁর অবদান ও কাব্যিক বৈশিষ্ট্য নিয়ে পাঠক, সাহিত্যিক ও সমালোচকদের মূল্যায়ন আরও বিস্তৃত আলোচনার দাবি রাখে। বিরহের অনুভূতি, ছন্দের কারুকার্য এবং জীবনঘনিষ্ঠ বিষয়বস্তুর সমন্বয়ে কবি মাজেদুল হক নিজের সাহিত্যিক পরিচয় নির্মাণ করে চলেছেন।


নেত্র দেশ ২৪

ব্যবস্থাপনা পরিচালক: আসিফ খান
নির্বাহী সম্পাদক: মোঃ রফিকুল ইসলাম শেখ

কপিরাইট © ২০২৬ । সর্বস্ব সংরক্ষিত নেত্র দেশ ২৪