ঢাকা    শুক্রবার, ১৬ অক্টোবর ২০২৬, ১ কার্তিক ১৪৩৩
নেত্র দেশ ২৪

নেত্রকোনায় ৫৩ ঘণ্টায় তিন হত্যাকাণ্ড জননিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ

নেত্রকোনার তিন উপজেলায় প্রায় ৫৩ ঘণ্টার ব্যবধানে তিনটি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে কেন্দুয়ায় সীমানা বিরোধের জেরে এক তরুণকে কুপিয়ে হত্যা, নেত্রকোনা সদর উপজেলায় হাত-পা বাঁধা অবস্থায় এক ইজিবাইকচালকের মরদেহ উদ্ধার এবং দুর্গাপুরে গুলি করে এক সাংবাদিককে হত্যার ঘটনা গঠেছে। পৃথক এসব ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। প্রতিটি ঘটনার রহস্য উদ্‌ঘাটন, জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত এবং সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছে স্থানীয় জনসাধারণ। পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গত ১৩ অক্টোবর দুপুরে কেন্দুয়ায় হামলার ঘটনা ঘটে। ওই দিন রাতেই চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান আবির হোসেন (২২)। এরপর ১৫ অক্টোবর দুপুরে নেত্রকোনা সদর উপজেলার একটি জঙ্গল থেকে রুকন মিয়া (৪০) নামে এক ইজিবাইকচালকের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। একই দিন সন্ধ্যায় দুর্গাপুরে গুলিতে নিহত হন সাংবাদিক লুৎফুজ্জামান আলিফ ফকির।কেন্দুয়ায় সীমানা বিরোধে প্রাণ গেল প্রবাসী তরুণেরনেত্রকোনার কেন্দুয়া উপজেলার রোয়াইলবাড়ি ইউনিয়নের পুরানবাড়ি গ্রামে বসতঘরের সীমানা নিয়ে বিরোধের জেরে আবির হোসেনকে কুপিয়ে হত্যার অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় তাঁর বাবা এনামুল হক (৪৭) গুরুতর আহত হয়েছেন।১৩ অক্টোবর বেলা আড়াইটার দিকে এ ঘটনা ঘটে। আহত বাবা-ছেলেকে প্রথমে কেন্দুয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। পরে তাঁদের অবস্থার অবনতি হলে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। সেখানে রাত আটটার দিকে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আবিরের মৃত্যু হয়।পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, সীমানা নিয়ে এনামুল হকের সঙ্গে তাঁর চাচাতো ভাই বকুল মিয়ার বিরোধ চলছিল। এর জেরে বকুল মিয়ার লোকজন দেশীয় অস্ত্র নিয়ে এনামুলের বাড়িতে হামলা চালান বলে অভিযোগ রয়েছে। এ সময় বাবা ও ছেলেকে কুপিয়ে আহত করা হয়।আবির সৌদি আরবপ্রবাসী ছিলেন। ঘটনার এক সপ্তাহ আগে ছুটিতে দেশে ফিরেছিলেন তিনি।কেন্দুয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) তরিকুল ইসলাম জানান, সীমানা নিয়ে বিরোধের জেরে এ ঘটনা ঘটেছে। ভুক্তভোগী পরিবারের পক্ষ থেকে অভিযোগ পেলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে তিনি জানান।জঙ্গলে হাত-পা বাঁধা মরদেহ, হত্যার কারণ অজানা১৫ অক্টোবর দুপুর আড়াইটার দিকে নেত্রকোনা সদর উপজেলার সিংহের বাংলা ইউনিয়নের নোয়াপাড়া বুইদার জঙ্গল থেকে রুকন মিয়ার মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।নিহত রুকন মিয়া মদনপুর এলাকার গিটুর পাড়ার হোসেন আলীর ছেলে। তিনি পরিবার নিয়ে নেত্রকোনা শহরের কুরপাড় এলাকায় ভাড়া বাসায় বসবাস করতেন।পরিবার ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, ১৪ অক্টোবর বিকেলে ইজিবাইক নিয়ে বাড়ি থেকে বের হওয়ার পর রুকন আর ফেরেননি। পরিবারের সদস্যরা বিভিন্ন স্থানে খোঁজাখুঁজি করেও তাঁর সন্ধান পাননি। পরদিন জঙ্গলে মরদেহ পড়ে থাকার খবর পেয়ে স্বজনেরা ঘটনাস্থলে গিয়ে তাঁকে শনাক্ত করেন।পুলিশ জানায়, রুকনের হাত-পা ও মুখ কাপড় দিয়ে প্যাঁচানো ছিল। শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাতের চিহ্নও পাওয়া গেছে। পরে ময়নাতদন্তের জন্য মরদেহটি নেত্রকোনা আধুনিক সদর হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়।নেত্রকোনার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) সজল কুমার সরকার জানান, খবর পেয়ে পুলিশ মরদেহ উদ্ধার করেছে। এ ঘটনায় পরবর্তী আইনগত কার্যক্রম প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।তবে রুকনকে হত্যার কারণ এবং এ ঘটনায় কারা জড়িত, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।দুর্গাপুরে গুলিতে সাংবাদিক নিহত১৫ অক্টোবর সন্ধ্যায় নেত্রকোনার দুর্গাপুর উপজেলার বিরিশিরি ইউনিয়নের তেলুঞ্জিয়া গ্রামে গুলিতে নিহত হন সাংবাদিক লুৎফুজ্জামান আলিফ ফকির।তিনি কলমাকান্দা উপজেলার পোগলা ইউনিয়নের সুনই গ্রামের বাসিন্দা ছিলেন। আইপি টিভি রূপসী বাংলার জেলা প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করার পাশাপাশি ‘ডিটেকটিভ আর্টিকেল’ নামে একটি ফেসবুক পেজ পরিচালনা করতেন।পুলিশ জানায়, তেলুঞ্জিয়া গ্রামে তাঁর শ্বশুরবাড়ি। ঘটনার রাতে তিনি বাড়ির সামনের একটি দোকানে গেলে আগে থেকে সেখানে অবস্থান নেওয়া দুই অজ্ঞাত যুবক তাঁকে লক্ষ্য করে একাধিক গুলি ছোড়ে। পরে তাঁকে দুর্গাপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।দুর্গাপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা খন্দকার শাকের আহমেদ জানান, নিহত সাংবাদিকের মাথা, গলা, বুকসহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে পাঁচটি গুলির চিহ্ন পাওয়া গেছে।নেত্রকোনার পুলিশ সুপার মো. তরিকুল ইসলাম বলেন, প্রাথমিক তদন্তে ঘটনাটিকে সুপরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড বলে ধারণা করা হচ্ছে। জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে পুলিশের অভিযান চলছে।উল্লেখ্য, গত বছরের ১০ নভেম্বর সোমেশ্বরী নদীর তেরিবাজার ঘাট এলাকায় দুর্বৃত্তদের হামলায় গুরুতর আহত হয়েছিলেন লুৎফুজ্জামান। আগের ওই হামলার সঙ্গে বর্তমান হত্যাকাণ্ডের কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা তদন্ত করে দেখা প্রয়োজন।তদন্তের অগ্রগতি ও নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্নঅল্প সময়ের ব্যবধানে তিনটি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা জেলায় জননিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি করেছে। যদিও ঘটনাগুলোর মধ্যে কোনো যোগসূত্র থাকার তথ্য এখনো পাওয়া যায়নি, তবে প্রতিটি ঘটনার পেছনের কারণ উদ্‌ঘাটন এবং জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করা জরুরি।কেন্দুয়ায় পারিবারিক বিরোধের জেরে প্রাণঘাতী হামলার অভিযোগ, সদর উপজেলায় এক ইজিবাইকচালকের হাত-পা বাঁধা মরদেহ উদ্ধার এবং দুর্গাপুরে সাংবাদিককে গুলি করে হত্যার ঘটনা—প্রতিটি ক্ষেত্রেই নিরপেক্ষ তদন্ত ও দ্রুত অগ্রগতি গুরুত্বপূর্ণ।বিশেষ করে সাংবাদিক লুৎফুজ্জামান আলিফ ফকির হত্যার ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত, হত্যার উদ্দেশ্য উদ্‌ঘাটন এবং আগের হামলার বিষয়টি খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। একই সঙ্গে অন্য দুটি হত্যাকাণ্ডের তদন্তেও যেন কোনো গাফিলতি না থাকে, তা নিশ্চিত করা জরুরি।এসব ঘটনায় সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা, পুলিশ দ্রুত তদন্ত শেষ করে প্রকৃত অপরাধীদের আইনের আওতায় আনবে। পাশাপাশি অপরাধ প্রতিরোধ, জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং ভুক্তভোগী পরিবারগুলো যাতে ন্যায়বিচার পায়, সে বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

নেত্রকোনায় ৫৩ ঘণ্টায় তিন হত্যাকাণ্ড জননিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ