নেত্রকোনার দুর্গাপুরে গুলিতে নিহত সাংবাদিক লুৎফুজ্জামান আলিফ ফকিরের মৃত্যুর পর তাঁর শেষ সময়ের অনুসন্ধানী কাজ নিয়ে নানা প্রশ্ন সামনে এসেছে। মাদক কারবার, চোরাচালান ও অবৈধ বালু-পাথর উত্তোলন নিয়ে তথ্য সংগ্রহ করতেন বলে জানিয়েছেন তাঁর সহকর্মী ও স্থানীয় কয়েকটি সূত্র। হত্যার আগের দিন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপরাধজগতের এক ব্যক্তির বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য প্রকাশের ইঙ্গিতও দিয়েছিলেন তিনি।
কিন্তু সেই তথ্য প্রকাশের আগেই খুন হন আলিফ। ফলে তাঁর শেষ অনুসন্ধানের বিষয়বস্তু কী ছিল এবং এর সঙ্গে হত্যাকাণ্ডের কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা নিয়ে আলোচনা তৈরি হয়েছে। তবে এসব বিষয় এখনো তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।
গত ১৫ অক্টোবর রাতে দুর্গাপুর পৌরসভার উতরাইল বাজার এলাকায় গুলিতে নিহত হন সাংবাদিক আলিফ ফকির। এ ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় সাংবাদিকেরা।
অপরাধ নিয়ে অনুসন্ধানের কথা জানিয়েছেন সহকর্মীরা
আলিফের সহকর্মীদের ভাষ্য অনুযায়ী, দুর্গাপুর ও কলমাকান্দা সীমান্ত এলাকার বিভিন্ন অপরাধ নিয়ে নিয়মিত খোঁজখবর রাখতেন তিনি। মাদক পাচার, চোরাচালান এবং অবৈধভাবে বালু-পাথর উত্তোলন নিয়ে তথ্য সংগ্রহ করতেন বলেও জানিয়েছেন তাঁরা।
স্থানীয় কয়েকটি সূত্রের দাবি, তথ্য সংগ্রহের সময় কখনো ছদ্মবেশ ধারণ করতেন আলিফ। তবে তাঁর অনুসন্ধানের সুনির্দিষ্ট বিষয়বস্তু, সংগৃহীত তথ্যের প্রকৃতি এবং কোন ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে নিয়ে তিনি প্রতিবেদন তৈরির প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, তা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
আলিফের মৃত্যুর আগে তাঁর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া পোস্টগুলো এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ সূত্র হতে পারে। তাঁর সংরক্ষিত নথি, ব্যক্তিগত নোট এবং অপ্রকাশিত প্রতিবেদন পাওয়া গেলে শেষ অনুসন্ধানের বিষয়টি পরিষ্কার হতে পারে।
আগের হামলার ঘটনাও তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ
আলিফের পরিবার ও সহকর্মীদের দাবি, এর আগেও হামলার শিকার হয়েছিলেন তিনি। তাঁদের ভাষ্য অনুযায়ী, গত বছরের জানুয়ারিতে দুর্গাপুর পৌর শহরের উকিলপাড়া এলাকায় এবং নভেম্বরে সোমেশ্বরী নদীর তেরিবাজার ঘাটে তাঁর ওপর হামলার ঘটনা ঘটে।
এসব ঘটনার সঙ্গে তাঁর সাংবাদিকতার কোনো সম্পর্ক ছিল কি না এবং আগের হামলাগুলোর সঙ্গে বর্তমান হত্যাকাণ্ডের যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন।
ভোটার নিবন্ধন নিয়ে অভিযোগ
কলমাকান্দা উপজেলা নির্বাচন কার্যালয়কে ঘিরে রোহিঙ্গা নাগরিকদের বাংলাদেশি পরিচয়ে ভোটার নিবন্ধন ও জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) তৈরির চেষ্টার অভিযোগও আলোচনায় এসেছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, পাঁচজন রোহিঙ্গা নাগরিকের পরিচয়সংক্রান্ত নথিতে স্থানীয় ঠিকানা ব্যবহারের বিষয়টি সামনে আসে। তবে অভিযোগের সত্যতা, সংশ্লিষ্ট নথির বৈধতা এবং এ ঘটনায় কারও অনিয়মের সম্পৃক্ততা রয়েছে কি না, তা নির্ভরযোগ্য নথি ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্যের ভিত্তিতে যাচাই করা প্রয়োজন।
এ অভিযোগের সঙ্গে সাংবাদিক আলিফের অনুসন্ধান কিংবা হত্যাকাণ্ডের সরাসরি কোনো সম্পর্ক রয়েছে—এমন তথ্য এখনো নিশ্চিত নয়।
পুরোনো মাদক মামলার তথ্য
সীমান্ত এলাকার মাদক কারবার নিয়ে আলোচনার মধ্যে ২০২২ সালে ময়মনসিংহে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের একটি অভিযানের তথ্যও সামনে এসেছে। ওই অভিযানে ইলিয়াস কাদের বাবুল, তাঁর স্ত্রী রোজিনা বেগমসহ সাতজনকে গ্রেপ্তারের খবর প্রকাশিত হয়েছিল।
তৎকালীন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বক্তব্য অনুযায়ী, তাঁদের বিরুদ্ধে মাদক কারবারে সম্পৃক্ততার অভিযোগ ছিল। তবে মামলাটির বর্তমান অবস্থা এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আদালতের কোনো সিদ্ধান্ত রয়েছে কি না, তা যাচাই ছাড়া এ বিষয়ে চূড়ান্ত মন্তব্য করা সমীচীন নয়।
এ পুরোনো মামলার সঙ্গে সাংবাদিক আলিফের অনুসন্ধান বা হত্যাকাণ্ডের কোনো যোগসূত্রও প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
হত্যার কারণ উদ্ঘাটনে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি
সাংবাদিক আলিফের হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত কারণ জানতে তাঁর শেষ অনুসন্ধানের বিষয়বস্তু, হত্যার আগে দেওয়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্ট এবং আগের হামলার অভিযোগ গুরুত্বের সঙ্গে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
একই সঙ্গে হত্যাকাণ্ডে সরাসরি জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করার পাশাপাশি পরিকল্পনা, অর্থায়ন এবং অন্য কারও সম্পৃক্ততার প্রমাণ রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা জরুরি।
আলিফের শেষ অনুসন্ধানের বিষয় কী ছিল, তাঁর সাংবাদিকতার সঙ্গে হত্যাকাণ্ডের কোনো সম্পর্ক রয়েছে কি না এবং কারা এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত—এসব প্রশ্নের উত্তর নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমেই বেরিয়ে আসতে পারে।