তাঁর ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য ছিল, তিনি কখনো প্রচলিত ধারার নায়ক হওয়ার চেষ্টা করেননি। তাঁর চেহারায় হিরোসুলভ কোমলতা ছিল না, ছিল রুক্ষতা। সেটাই শক্তিতে পরিণত করেছিলেন
গতকাল ৭৫ বছর বয়সে চিরনিদ্রায় চলে গেলেন নানা পাটেকর। তাঁর মৃত্যুতে ভারতীয় অভিনয় জগতের বর্ণময় এক অধ্যায়ের অবসান হলো। এক সময় বলিউডের নায়ক মানেই ছিল তারকাসুলভ চেহারা, পেশিবহুল দেহ আর পর্দাজুড়ে রোমান্টিকতা। সে পথে হাঁটেননি নানা পাটেকর। অভিনয়ের শক্তিতে শুধু নায়ক না হয়ে নায়কের চেয়েও বেশি কিছু হয়ে উঠেছিলেন তিনি। তাঁর রুক্ষ চেহারা, গভীর কণ্ঠস্বর, তীক্ষè চোখ আর সংলাপ বলার অনন্য ভঙ্গি তাঁকে সবার চেয়ে আলাদা করে তুলেছিল। কখনো তিনি দুর্ধর্ষ পুলিশ কর্মকর্তা, কখনো উন্মাদ খলনায়ক, কখনো রাগী যুবক, আবার কখনো ইমোশনাল চরিত্রে দর্শকের সামনে দাঁড়াতেন। চরিত্রের ধরন বদলালে বদলে যেতেন তিনিও। তাঁর অভিনয়ের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল ‘বিশ্বাসযোগ্যতা’। অবিকল চরিত্রের মানুষটি হয়ে উঠতেন তিনি। অভিনয়ে বাড়তি আড়ম্বর ছিল না। পর্দায় তাঁকে দেখলেই দর্শকের মনোযোগ আটকে যেত। ‘ওয়েলকাম’-এর মতো কমেডি ছবিতে তাঁর অভিনয় যেমন দর্শকদের হাসিয়েছে। আবার ‘ক্রান্তিবীর’, ‘অগ্নিসাক্ষী’, ‘অপহরণ’-এর মতো ছবিতে তাঁর অভিনয় অন্য এক নানা পাটেকরকে সামনে এনেছে। ২০০৪ সালের ‘আব তাক ছাপ্পান’ ছবিতে ইন্সপেক্টর সাধু আগাশের চরিত্রে তিনি হিন্দি সিনেমার ‘এনকাউন্টার স্পেশালিস্ট’ পুলিশ চরিত্রকে নতুন মাত্রা দেন। অপরাধ দমনে নেমে এক পুলিশ কর্মকর্তা ধীরে ধীরে কীভাবে ব্যক্তিগত ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেন, সেই জটিলতাও ফুটিয়ে তুলেছিলেন তিনি। পুলিশের চরিত্রে তাঁর দাপট নতুন কিছু ছিল না। ১৯৯১ সালের ‘যশবন্ত’ ছবিতেও তাঁর অভিনয় দর্শকের মনে দাগ কাটে। তাঁর সংলাপ বলার ভঙ্গি, রাগ এবং চোখের অভিব্যক্তি চরিত্রগুলোকে পর্দার সাধারণ পুলিশ কর্মকর্তা থেকে আলাদা করে তুলেছিল।
নানা পাটেকরের অভিনয়জীবনের অন্যতম সেরা চরিত্র ‘আন্না শেঠ’। বিদু বিনোদ চোপড়ার ১৯৮৯ সালের ‘পরিন্দা’ ছবিতে এই ভয়ঙ্কর অপরাধীর চরিত্রে তাঁর অভিনয় আজো হিন্দি সিনেমার আইকনিক খলচরিত্র হয়ে রয়েছে।
এই চরিত্রের উন্মাদ হাসি, ভয়ঙ্কর উপস্থিতি এবং হিংস্র মানসিকতা তাঁকে এমনভাবে ফুটিয়ে তুলেছিলেন যে, দর্শকের কাছে তিনি একই সঙ্গে আতঙ্ক ও বিস্ময়ের কারণ হয়ে দাঁড়ান। এর আগে মীরা নায়ারের ‘সালাম বোম্বে!’ ছবিতেও তাঁকে দেখা গিয়েছিল ভয়ঙ্কর মাদক ব্যবসায়ীর চরিত্রে। সহজেই তিনি খলনায়কের ছকে আটকে যেতে পারতেন। কিন্তু নানা পাটেকর সেই পথ বেছে নেননি। ১৯৯১ সালে ‘প্রহার’ নির্মাণ করে তিনি প্রমাণ করেন, শুধু অভিনয় নয়, গল্প বলার ক্ষেত্রেও তাঁর নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে। ছবিতে তিনি অভিনয় করেন মেজর প্রতাপ চৌহানের চরিত্রে। সামরিক শৃঙ্খলা, দেশপ্রেম ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াই, সব মিলিয়ে চরিত্রটি ছিল তাঁর আগের ভিলেন চরিত্রগুলোর বিপরীত। ছবিতে মাধুরী দীক্ষিতও গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে অভিনয় করেন। মজার বিষয়, ‘পরিন্দা’ ছবিতেও মাধুরী ছিলেন। ১৯৯৪ সালের ‘ক্রান্তিবীর’ নানা পাটেকরের ক্যারিয়ারে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। অন্যায়, দুর্নীতি ও সামাজিক অবিচারের বিরুদ্ধে ক্ষুব্ধ এক যুবকের চরিত্রে তাঁর অভিনয় ব্যাপক সাড়া ফেলে। নানা পাটেকরের অভিনয়ে রাগ ছিল, কিন্তু সেই রাগ কখনো শুধু চিৎকারে সীমাবদ্ধ থাকেনি। তাঁর চোখ, শরীরী ভাষা ও কণ্ঠের ওঠানামা চরিত্রের ভিতরের অস্থিরতাকে সামনে নিয়ে আসত। ‘তিরঙ্গা’র মতো উচ্চকণ্ঠ দেশাত্মবোধক ছবিতেও তাঁর অভিনয়ের নিজস্ব ছাপ ছিল। আবার ‘রাজু বান গয়া জেন্টলম্যান’, ‘ওয়েলকাম’ কিংবা ‘নটসম্রাট’-এর মতো ছবিতে তাঁকে দেখা গেছে ভিন্ন মেজাজে। তাঁর অভিনয় মানেই শুধু তীব্র সংলাপ নয়। ১৯৯৬ সালের সঞ্জয় লীলা বানসালির ‘খামোশি: দ্য মিউজিক্যাল’ তার বড় প্রমাণ। ছবিতে তিনি জোসেফ ব্রাগাঞ্জার চরিত্রে অভিনয় করেন। সেখানে তিনি একজন শ্রবণ ও বাকপ্রতিবন্ধী বাবা ও স্বামীর চরিত্রে কাজ করেন। এখানে তাঁর অভিনয়ের শক্তি সংলাপে নয়, ছিল নীরবতায়। চোখের দৃষ্টি, মুখের অভিব্যক্তি ও শরীরী ভাষার মাধ্যমে তিনি চরিত্রটির আবেগ প্রকাশ করেন। এই চরিত্রটি দেখিয়ে দিয়েছিল, পর্দায় বড় বড় সংলাপ ছাড়াও একজন অভিনেতা কতটা গভীর অভিনয় করতে পারেন। হিন্দি সিনেমার পাশাপাশি মারাঠি চলচ্চিত্র ও মঞ্চেও ছিল তাঁর শক্ত অবস্থান। অভিনয়ের পাশাপাশি পরিচালনা ও সামাজিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত ছিলেন তিনি। ২০১৬ সালে ইন্ডিয়া টাইমসের প্রতিবেদনে উঠে আসে, নিজের আয়ের প্রায় ৯০ শতাংশ দাতব্য কাজে ব্যয় করতেন নানা পাটেকর। অথচ আর্থিক টানাপোড়নে কেটেছিল তাঁর শৈশব। মাত্র ১৩ বছর বয়সে মাসে ৩৫ টাকা ও একবেলা খাবারের বিনিময়ে সিনেমার পোস্টার আঁকতেন। কলেজে পড়ার সময় জেব্রা ক্রসিং এঁকে পেতেন ১৫ টাকা। সেই মানুষটি ভারতীয় সিনেমায় খ্যাতির আকাশছোঁয়ার পরও খুব সাধারণ জীবনযাপন করতেন। মুম্বাইয়ের সাধারণ অ্যাপার্টমেন্টে থাকার পাশাপাশি গ্রামের বাড়িতে সময় কাটাতে ভালোবাসতেন। তিনবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার তাঁর দীর্ঘ অভিনয়জীবনের অন্যতম বড় স্বীকৃতি। নানা পাটেকর হয়তো আর নতুন কোনো চরিত্রে পর্দায় ফিরবেন না। কিন্তু ভারতীয় সিনেমার ইতিহাসে তাঁর অভিনীত চরিত্রগুলো অমলিন হয়ে থাকবে।
- বিবিসি ও ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস অবলম্বনে